চড়ুই মিডিয়া | বিশেষ কলাম
একটি সভ্য রাষ্ট্রকে বিচার করার অন্যতম মানদণ্ড হলো—তার আইন কতটা নিরপেক্ষ এবং সেই আইন প্রয়োগে রাষ্ট্র কতটা সমদর্শী। রাষ্ট্রের শক্তি তার পুলিশ, আদালত বা প্রশাসনের মধ্যে নয়; বরং তার নৈতিক বৈধতার মধ্যে নিহিত। আর সেই বৈধতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় তখন, যখন রাষ্ট্রকে ভিন্ন ভিন্ন নাগরিক গোষ্ঠীর প্রতি একই মানদণ্ড প্রয়োগ করতে হয়।
সম্প্রতি কলকাতার ঐতিহাসিক রেড রোডকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা মূলত একটি রাস্তা বন্ধ রাখার প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে নয়; বরং রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং নাগরিক সমতার ধারণাকে কেন্দ্র করে।
বিশ্ব যোগ দিবস উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অংশগ্রহণে আয়োজিত কর্মসূচির জন্য রেড রোড এবং আশপাশের একাধিক সড়ক দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অথচ অতীতে একই স্থানে ঈদের নামাজ আয়োজনের ক্ষেত্রে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যানজট ও জনদুর্ভোগের যুক্তি তুলে ধরে অনুমতি না দেওয়ার ঘটনাও রয়েছে।
প্রশ্নটি তাই রাস্তা নিয়ে নয়।
প্রশ্নটি হলো—একই রাষ্ট্র, একই রাস্তা, একই জনদুর্ভোগ; কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত কেন?
রাষ্ট্রের যুক্তি বনাম নাগরিকের প্রশ্ন
যে কোনো রাষ্ট্রই নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা এবং জনস্বার্থের অজুহাতে কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোও তা করে। কিন্তু রাজনৈতিক দর্শনের একটি মৌলিক নীতি হলো—”যে নিয়ম একজনের জন্য, সেই নিয়ম অন্যজনের জন্যও হতে হবে।”
যদি জনদুর্ভোগের কারণে ১৫ মিনিটের নামাজের জন্য রাস্তা বন্ধ রাখা অগ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে ৪৫ মিনিটের যোগব্যায়ামের জন্য একাধিক রাস্তা বন্ধ রাখা কীভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে?
যদি ধর্মীয় অনুষ্ঠান জনপথে আয়োজন অনুচিত হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক চরিত্রসম্পন্ন কোনো আয়োজনের জন্য জনপথ ব্যবহারের যৌক্তিকতা কোথায়?
এখানেই জন্ম নেয় “ডাবল স্ট্যান্ডার্ড” বা দ্বৈত মানদণ্ডের অভিযোগ।
বিশ্বের অন্যান্য গণতন্ত্র কী করে?
পৃথিবীর উন্নত ও প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা সাধারণত দুটি নীতি অনুসরণ করে।
প্রথমত, জনসাধারণের রাস্তা কোনো সম্প্রদায়ের স্থায়ী দখলে যেতে পারে না।
দ্বিতীয়ত, বিশেষ উপলক্ষে সব সম্প্রদায়কেই নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে সমান সুযোগ দেওয়া হয়।
যুক্তরাজ্য
লন্ডনে বড়দিনের শোভাযাত্রা, ঈদ উৎসব, প্রাইড প্যারেড কিংবা ম্যারাথন—সব ক্ষেত্রেই রাস্তা সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়। কিন্তু প্রশাসন অনুষ্ঠানটির ধর্মীয় পরিচয় দেখে নয়, বরং জনস্বার্থ, নিরাপত্তা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়।
যুক্তরাষ্ট্র
নিউইয়র্কে থ্যাঙ্কসগিভিং প্যারেড, সেন্ট প্যাট্রিকস ডে, ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার মিছিল কিংবা মুসলিম সম্প্রদায়ের ঈদ সমাবেশ—সব ক্ষেত্রেই পূর্বনির্ধারিত অনুমতির মাধ্যমে জনপথ ব্যবহার করা হয়। এখানে মূল প্রশ্ন হয় নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা; অংশগ্রহণকারীদের ধর্ম নয়।
সিঙ্গাপুর
সিঙ্গাপুর রাষ্ট্রীয়ভাবে অত্যন্ত কঠোর। কিন্তু সেখানে থাইপুসাম, চাইনিজ নিউ ইয়ার,শুক্রবারে জুম্মার নামাজের জন্য মসজিদের পাশের রাস্তাগুলো প্রায় বন্ধ থাকে এমনকি ন্যাশনাল ডে কিংবা অন্যান্য বৃহৎ সমাবেশের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে অনুমতি দেয়। কোনো সম্প্রদায়ের জন্য এক ধরনের নিয়ম এবং অন্য সম্প্রদায়ের জন্য আরেক ধরনের নিয়ম চালু করা হয় না।
সভ্য রাষ্ট্রগুলো বুঝেছে—রাষ্ট্রের কাজ ধর্ম নির্ধারণ করা নয়; বরং সবার জন্য একই নিয়ম নিশ্চিত করা।
আদালত, অধিকার এবং বাস্তবতা
ভারতের বিভিন্ন আদালত সম্প্রতি জনপথে ধর্মীয় অনুষ্ঠান নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এলাহাবাদ হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, সরকারি স্থানে নামাজ আদায় মৌলিক অধিকার নয়।
আইনগতভাবে এই অবস্থানের যৌক্তিকতা থাকতে পারে।
কিন্তু এখানেই আরেকটি প্রশ্ন উঠে আসে—
যদি জনপথে নামাজ মৌলিক অধিকার না হয়, তাহলে জনপথে অন্যান্য ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রেও কি একই মানদণ্ড প্রযোজ্য?
রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা শুধু আদালতের রায়ে নয়; বরং সেই রায়ের সর্বজনীন প্রয়োগে প্রকাশ পায়।
অন্যথায় আইন একটি নীতিগত অবস্থান না হয়ে রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
সংখ্যাগরিষ্ঠতার রাজনীতি ও রাষ্ট্রের নৈতিক সংকট
আধুনিক গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো সংখ্যাগরিষ্ঠতার অহংকার।
ফরাসি দার্শনিক অ্যালেক্সিস দ্য টকভিল একে বলেছিলেন—”Tyranny of the Majority” বা সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরতন্ত্র।
যখন রাষ্ট্র মনে করতে শুরু করে যে সংখ্যাগরিষ্ঠের সংস্কৃতি রাষ্ট্রের সংস্কৃতি, সংখ্যাগরিষ্ঠের বিশ্বাস রাষ্ট্রের বিশ্বাস, তখন সংখ্যালঘুর অধিকার ধীরে ধীরে নাগরিক অধিকার থেকে “অনুগ্রহ” বা “সুবিধা”তে পরিণত হয়।
ইতিহাস বলে, এই পথ কখনোই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আনে না।
কারণ রাষ্ট্রের শক্তি সংখ্যাগরিষ্ঠের করতালিতে নয়; বরং সংখ্যালঘুর আস্থায়।
রেড রোডের আসল প্রশ্ন
রেড রোডের বিতর্কের কেন্দ্রে আসলে নামাজ নেই, যোগব্যায়ামও নেই।
এখানে মূল প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র কি নাগরিককে প্রথমে নাগরিক হিসেবে দেখছে, নাকি তার ধর্মীয় পরিচয়কে আগে বিবেচনা করছে?
একটি রাষ্ট্র যদি একই পরিস্থিতিতে ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীর জন্য ভিন্ন নিয়ম তৈরি করে, তাহলে সমস্যাটি প্রশাসনিক নয়; তা নৈতিক।
কারণ বৈষম্য শুরু হয় আইন ভাঙা দিয়ে নয়, বরং আইনের অসম প্রয়োগ দিয়ে।
ধরা যাক, আগামীকাল পৃথিবীর সব মানুষ তাদের ধর্ম, জাতি, ভাষা এবং রাজনৈতিক পরিচয় ভুলে গেল।
তখন কি রেড রোডের প্রশ্নটি থাকবে?
হ্যাঁ, থাকবে।
কারণ প্রশ্নটি ধর্মের নয়; ন্যায়ের।
জন রলস তাঁর বিখ্যাত “Veil of Ignorance” তত্ত্বে বলেছিলেন, এমন একটি সমাজ কল্পনা করতে হবে যেখানে কেউ জানে না সে সংখ্যাগরিষ্ঠ না সংখ্যালঘু, ধনী না গরিব, ক্ষমতাবান না দুর্বল। সেই অবস্থান থেকে যে নিয়মকে ন্যায়সঙ্গত মনে হবে, সেটিই প্রকৃত ন্যায়।
রেড রোড বিতর্ককে যদি সেই পর্দার আড়াল থেকে দেখা যায়, তাহলে উত্তরটি সহজ—
যে নিয়ম যোগব্যায়ামের জন্য প্রযোজ্য, সেই নিয়ম নামাজের জন্যও প্রযোজ্য হবে।
যে নিয়ম দুর্গাপূজার জন্য প্রযোজ্য, সেই নিয়ম ঈদের জন্যও প্রযোজ্য হবে।
আর যদি কোনো কিছু নিষিদ্ধ হয়, তবে তা সবার জন্যই নিষিদ্ধ হবে।
সভ্যতার প্রকৃত পরিচয় এখানেই।
কারণ আইনের চোখ বেঁধে রাখা হয় এই জন্যই—যেন সে মানুষের মুখ, ধর্ম কিংবা পরিচয় না দেখে; শুধু ন্যায়বিচার দেখে।