মালয়েশিয়াজুড়ে অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান: শতাধিক আটক, চলছে ব্যাপক ডিপোর্টেশন ও আজীবন ব্ল্যাকলিস্ট
বিশেষ প্রতিবেদক | কুয়ালালামপুর
মালয়েশিয়ায় অবৈধভাবে অবস্থানরত বিদেশি শ্রমিক ও অভিবাসীদের জন্য ঘোষিত বিশেষ সাধারণ ক্ষমা কর্মসূচি (B1G Programme) গত ৩০ এপ্রিল শেষ হওয়ার পর থেকেই দেশজুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক চিরুনি অভিযান। দেশটির ইমিগ্রেশন বিভাগ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করে রাজধানী কুয়ালালামপুর, কেদাহ, সেলাঙ্গর, জোহরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে দিন-রাত সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করছে।
অভিযানে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের অসংখ্য অবৈধ শ্রমিক আটক হচ্ছেন। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরত (ডিপোর্ট) পাঠানো হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অভিযানের তীব্রতা আগামী মাসগুলোতেও অব্যাহত থাকবে।
সাজা শেষে ৯৪ জন বিদেশি নাগরিককে নিজ দেশে ফেরত
মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কেদাহ রাজ্যে অবৈধভাবে অবস্থানের অভিযোগে আটক ৯৪ জন বিদেশি নাগরিককে তাদের নির্ধারিত সাজা সম্পন্ন করার পর নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
ডিপোর্ট হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মিয়ানমারসহ মোট সাতটি দেশের নাগরিক রয়েছেন। তাদের কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (KLIA) হয়ে নিজ দেশে পাঠানো হয়।
আজীবনের জন্য ব্ল্যাকলিস্ট: আর ফিরতে পারবেন না মালয়েশিয়ায়
ইমিগ্রেশন বিভাগের মহাপরিচালক কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, যারা সাধারণ ক্ষমার সুযোগ গ্রহণ করেননি এবং বর্তমানে অভিযানে আটক হচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
আটক ব্যক্তিদের শুধু ডিপোর্টই করা হচ্ছে না, বরং মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন ডেটাবেজে তাদের নাম স্থায়ীভাবে ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ করা হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে তারা বৈধ কিংবা অবৈধ—কোনো উপায়েই মালয়েশিয়ায় প্রবেশের অনুমতি পাবেন না।
নিয়োগকর্তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা
মালয়েশিয়া সরকার এবার শুধু অবৈধ শ্রমিকদের নয়, তাদের নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান ও আশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠানে অবৈধ শ্রমিক পাওয়া গেলে প্রতি শ্রমিকের জন্য ১০,০০০ থেকে ৫০,০০০ রিঙ্গিত পর্যন্ত জরিমানা করা হতে পারে। এছাড়া অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট মালিক বা দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের কারাদণ্ডের মুখোমুখিও হতে হতে পারে।
আপাতত বন্ধ নতুন বৈধকরণ (RTK) কর্মসূচি
মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বর্তমানে নতুন করে কোনো ব্যাপক ভিত্তিক বৈধকরণ বা ‘রিক্যালিব্রেশন’ (RTK 3.0) কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা নেই।
তবে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে এবং বিভিন্ন খাতে শ্রমিক সংকট মোকাবিলার জন্য সরকার বৈধ বিদেশি কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া আরও সহজ করার বিষয়ে কাজ করছে। অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলো নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করে নতুন কর্মী নিয়োগের সুযোগ পাবে।
🇧🇩 বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য জরুরি সতর্কতা
মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের প্রতি অনুরোধ করা হচ্ছে—
✔ সবসময় আসল পাসপোর্ট ও বৈধ কাজের অনুমতিপত্র (I-Kad) সঙ্গে রাখুন।
✔ ভুয়া ভিসা, জাল কাগজপত্র বা দালালচক্রের প্রলোভন থেকে দূরে থাকুন।
✔ ইমিগ্রেশন সংক্রান্ত যেকোনো সমস্যায় সরাসরি বাংলাদেশ হাইকমিশন, কুয়ালালামপুরের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
✔ কর্মস্থল বা আবাসস্থলে আকস্মিক অভিযানের ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে বৈধ নথিপত্র হালনাগাদ রাখুন।
শেষ কথা
সাধারণ ক্ষমার সময়সীমা শেষ হওয়ার পর মালয়েশিয়া সরকার অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ কঠোরতা প্রদর্শন করছে। ফলে বৈধ কাগজপত্র ছাড়া অবস্থানরত বিদেশি শ্রমিকদের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। প্রবাসীদের আইন মেনে চলা এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র সবসময় সঙ্গে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।