চড়ুই মিডিয়া | বিশেষ কলাম
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতা কখনো শুধু শাসনের উপকরণ নয়, অনেক সময় তা হয়ে ওঠে স্মৃতি নির্মাণের কারখানা। কোথাও সেতুর নাম, কোথাও স্টেডিয়াম, কোথাও বিমানবন্দর, কোথাও আবার পুরো প্রশাসনিক ইউনিট—সবখানেই ক্ষমতাবানদের পদচিহ্ন খোদাই করার এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা চলে এসেছে বছরের পর বছর।
সাম্প্রতিক বিতর্কে বগুড়ার নবগঠিত মোকামতলা উপজেলায় নতুন ইউনিয়নের নামকরণ সেই পুরোনো গল্পকেই নতুন মোড়কে ফিরিয়ে এনেছে। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বংশ এবং তাঁর দুই ছেলের নামের সঙ্গে মিল রেখে ইউনিয়নের নাম নির্ধারণ করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদেও প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিমন্ত্রী অবশ্য দাবি করেছেন, ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’ নাম দুটি স্থানীয় প্রশাসনের যাচাই-বাছাই এবং গণশুনানির ভিত্তিতেই নির্ধারণ করা হয়েছে; এটি নিছক কাকতালীয়।
কাকতালীয় ঘটনা পৃথিবীতে ঘটে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে কাকতালীয় ঘটনাগুলোরও অদ্ভুত রাজনৈতিক বংশপরিচয় থাকে।
একসময় আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল—রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো, প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পের নামকরণে দলীয় ইতিহাস ও পারিবারিক ঐতিহ্যকে অতিমাত্রায় প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। বঙ্গবন্ধু, শেখ পরিবার কিংবা দলীয় নেতাদের নামে নামকরণের দীর্ঘ তালিকা সেই বিতর্ককে বহুবার উসকে দিয়েছে।
অন্যদিকে বিএনপিও এই সংস্কৃতির বাইরে ছিল না। ক্ষমতায় থাকাকালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া কিংবা দলীয় আদর্শিক পরিচয়ের ছাপ প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর নানা স্তরে বসানোর চেষ্টা নিয়ে সমালোচনা কম হয়নি।
অর্থাৎ দুই প্রধান দলই ভিন্ন পতাকা হাতে একই রাজনৈতিক শিল্পচর্চা করেছে—ক্ষমতাকে স্মৃতিফলকে পরিণত করার শিল্প।
কিন্তু মীর শাহে আলমের সাম্প্রতিক ঘটনাটি বিতর্ককে আরও সূক্ষ্ম জায়গায় নিয়ে গেছে। এখানে কোনো জাতীয় নেতা বা ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের নাম নয়, অভিযোগ উঠেছে সরাসরি নিজের পারিবারিক পরিচয় ও সন্তানের নামের প্রতিফলন ঘটানোর। যদি অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে এটি আর দলীয় ঐতিহ্যের রাজনীতি নয়; এটি ক্ষমতার ব্যক্তিগতকরণ।
রাষ্ট্রের মানচিত্র কি পরিবারের অ্যালবাম?
প্রশ্নটা সেখানেই।
একটি ইউনিয়নের নাম সাধারণত এলাকার ইতিহাস, ভূগোল, সংস্কৃতি, জনপদ বা ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করে। সেই নাম প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করে। কিন্তু যখন নামকরণ ঘিরে এমন বিতর্ক ওঠে, তখন মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে—এটি কি জনগণের প্রশাসনিক ইউনিট, নাকি কোনো রাজনৈতিক পরিবারের স্মারক ফলক?
মজার বিষয় হলো, বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রায় সব পক্ষই ক্ষমতায় থাকলে নামকরণের রাজনীতি পছন্দ করে, আর বিরোধী দলে গেলে সেটাকেই ‘ব্যক্তিপূজা’ বলে আখ্যা দেয়। যেন রাষ্ট্র একটি বিশাল ব্ল্যাকবোর্ড; সরকার বদলালেই নতুন চক হাতে নতুন নাম লেখা শুরু হয়।
মোকামতলার ঘটনাও সেই চক্রের নতুন অধ্যায় মাত্র।
প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, সীমান্ত ইউনিয়নের নাম সীমান্তবর্তী অবস্থানের কারণে এবং দিগন্ত ইউনিয়নের নাম ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় রাখা হয়েছে। ব্যাখ্যা হিসেবে কথাগুলো গ্রহণযোগ্য শোনাতে পারে। কিন্তু গণতন্ত্রে শুধু ব্যাখ্যা যথেষ্ট নয়, বিশ্বাসযোগ্যতাও জরুরি। আর যখন কোনো নাম সরাসরি ক্ষমতাবান ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের নামের সঙ্গে মিলে যায়, তখন প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক।
বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি সম্ভবত এখানেই—এখানে জনগণ অনেক সময় উন্নয়নের চেয়ে নামফলক বেশি দেখে। রাস্তা কার নামে, সেতু কার নামে, হল কার নামে, ইউনিয়ন কার নামে—এসব নিয়ে যত আলোচনা হয়, সেবার মান নিয়ে তার অর্ধেকও হয় না।
শেষ পর্যন্ত ইউনিয়নের নাম সীমান্ত, দিগন্ত বা অন্য কিছু হওয়া বড় কথা নয়। বড় কথা হলো, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে জনস্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত প্রভাবের ছায়া পড়ছে কি না। কারণ ইতিহাস বলছে, ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু মানচিত্রে বসানো নাম অনেক দীর্ঘজীবী।
আর বাংলাদেশের রাজনীতি যেন বারবার একই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে—
রাষ্ট্র কি জনগণের, নাকি ক্ষমতাবানদের পারিবারিক স্মৃতিকথার সম্প্রসারিত সংস্করণ?
— চড়ুই মিডিয়া রাজনৈতিক ডেস্ক