স্বর্ণের দামে ইউনিয়ন কিনছে আমাদের রাজনীতিবিদরা!”
“যেখানে সীমান্ত তোমার, সেখানে বসন্ত আমার”—বাংলা গানের এই চিরসবুজ লাইন বহুদিন ধরেই প্রেম আর অনুভূতির প্রতীক।
কিন্তু বগুড়ার শিবগঞ্জে সাম্প্রতিক ইউনিয়ন নামকরণ বিতর্কের পর লাইনটি যেন নতুন অর্থ খুঁজে পেয়েছে।
যেখানে সীমান্ত তোমার, সেখানে দিগন্তও তোমার। সেখানে স্বর্ণও তোমার। সেখানে মীরবাড়িও তোমার।
ফলে প্রশ্ন উঠছে—এটি কি কেবল কাকতালীয় নামের মিল, নাকি ক্ষমতার মানচিত্রে পরিবারের পদচিহ্ন স্থায়ী করে রাখার এক নতুন অধ্যায়?
কারণ ইউনিয়নের নাম সাধারণত একটি জনপদের ইতিহাস বহন করে। কিন্তু যখন একের পর এক নাম ঘিরে একই পরিবারের ছায়া দেখা যায়, তখন বিতর্কও আর শুধু নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা গিয়ে ঠেকে ক্ষমতা, প্রভাব এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতার প্রশ্নে।
প্রথমে এল ‘সীমান্ত’।
পরে এল ‘দিগন্ত’।
তারপর গ্যাজেটে দেখা গেল ‘মীরবাড়ি’।
এবার নতুন বিতর্ক—‘স্বর্ণগ্রাম’।
একটি, দুটি নয়; অভিযোগ অনুযায়ী নতুন ইউনিয়নের নামগুলোর দিকে তাকালে মনে হচ্ছে যেন কোনো প্রশাসনিক মানচিত্র নয়, বরং একটি পারিবারিক অ্যালবামের সূচিপত্র পড়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, ‘সীমান্ত’ প্রতিমন্ত্রীর এক ছেলের নাম, ‘দিগন্ত’ আরেক ছেলের নাম, ‘মীরবাড়ি’ তাঁর পারিবারিক পরিচয়ের অংশ, আর ‘স্বর্ণগ্রাম’ নামটি এসেছে মেয়ের ডাকনাম ‘স্বর্ণ’ থেকে।
যদি সবই কাকতালীয় হয়, তাহলে এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর কাকতালীয় ঘটনাগুলোর একটি।
কারণ সাধারণত একটি ইউনিয়নের নাম হয় এলাকার নদী, খাল, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, সংস্কৃতি বা জনপদের ঐতিহ্যের ভিত্তিতে। কিন্তু এখানে বিতর্ক এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে মানুষ প্রশ্ন করতে শুরু করেছে—নতুন ইউনিয়নগুলো কি জনগণের পরিচয় বহন করছে, নাকি কোনো রাজনৈতিক পরিবারের পরিচয় সংরক্ষণ করছে?
গণতন্ত্রের সবচেয়ে সূক্ষ্ম সংকট তখনই শুরু হয়, যখন ক্ষমতাবানরা রাষ্ট্রকে নিজেদের আয়নায় দেখতে শুরু করেন।
রাস্তা তাঁর নামে।
সেতু তাঁর নামে।
প্রতিষ্ঠান তাঁর নামে।
আর এখন অভিযোগ উঠছে, ইউনিয়নও পরিবারের নামে।
ইতিহাসের এক অদ্ভুত নিয়ম আছে। ক্ষমতাবানরা প্রায়ই মনে করেন, নামের মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের স্থায়ী করে ফেলবেন। কিন্তু ইতিহাস শেষ পর্যন্ত নামফলক নয়, কাজকেই মনে রাখে।
প্রশ্ন তাই এখন নাম নিয়ে নয়।
প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্রের মানচিত্রে জনগণের ছাপ বেশি থাকবে, নাকি ক্ষমতাবানদের পারিবারিক স্বাক্ষর?
কারণ ইউনিয়ন পরিষদ কোনো পারিবারিক সম্পত্তি নয়।
এটি জনগণের প্রশাসনিক পরিচয়।
আর জনগণের পরিচয় কখনো কোনো পরিবারের উত্তরাধিকার হতে পারে না।