বাংলাদেশ সরকারের তথ্য, পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি এবং সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান (যা কলামের প্রেক্ষাপটে ডা. জাহিদুর রহমান হিসেবে আলোচিত) ভারতের দিল্লি বিমানবন্দর থেকে এন্ট্রি না নিয়ে বাংলাদেশে ফেরত এসেছেন। ইন্ডিয়ান ওশেন রিম অ্যাসোসিয়েশন (IORA)-এর একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়ে দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভারতীয় ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের হয়রানি ও ‘নিরাপত্তা ওয়াচলিস্টের ত্রুটি’র অজুহাতে দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখার প্রতিবাদে তিনি নিজ আত্মসম্মান রক্ষার্থে দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন।
দিল্লির ইমিগ্রেশন ও বাংলাদেশের আত্মসম্মান: একটি অনাকাঙ্ক্ষিত কূটনৈতিক ধাক্কা
– রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট
কূটনীতিতে ‘পারস্পরিক শ্রদ্ধা’ এবং ‘প্রটোকল’ শব্দ দুটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিদের সফর কেবল একটি সাধারণ ভ্রমণ নয়, বরং তা দুটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রতিচ্ছবি। গত ১৪ জুন (রবিবার) দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার, পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি এবং সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহিদুর রহমানের (দাপ্তরিক নাম ডা. জাহেদ উর রহমান) সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি আমাদের কূটনৈতিক অঙ্গনে এক বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে হাজির হয়েছে।
ইন্ডিয়ান ওশেন রিম অ্যাসোসিয়েশন (IORA)-এর উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিতে তিনি দিল্লি গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে তাঁকে স্বাগত জানানোর পরিবর্তে ভারতীয় ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ যে আচরণ করেছে, তা কেবল অনাকাঙ্ক্ষিতই নয়, বরং চরম আপত্তিকর।
বিমানবন্দরে আসলে কী ঘটেছিল?
বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আগে থেকেই এই রাষ্ট্রীয় সফরের ব্যাপারে কূটনৈতিক নোটের মাধ্যমে অবহিত করা হয়েছিল。 তা সত্ত্বেও ডা. জাহিদুর রহমান দিল্লি বিমানবন্দরে নামার পর ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাঁকে দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টা আটকে রাখে। ভারতীয় কিছু গণমাধ্যমের (যেমন নিউজ১৮) দাবি অনুযায়ী, ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থার একটি পুরোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমভিত্তিক ‘ওয়াচলিস্ট’ বা কালো তালিকায় তাঁর নাম রয়ে গিয়েছিল। প্রশাসনিক ভুলের কারণে সেটি আপডেট না হওয়ায় এই জটিলতা তৈরি হয়।
দীর্ঘ জেরা এবং দিল্লির উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপে পরবর্তীতে তাঁকে ভারতে প্রবেশের ছাড়পত্র দেওয়া হলেও, ততক্ষণে একজন রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধির আত্মসম্মানে আঘাত লেগে গেছে। ভারতের এই ‘অসৌজন্যমূলক’ আচরণের প্রতিবাদে এবং দেশের মর্যাদা রক্ষার্থে ডা. জাহিদুর রহমান দিল্লি ত্যাগ করে কলম্বো হয়ে ঢাকায় ফেরত আসার সিদ্ধান্ত নেন।
এটি কি শুধুই ‘প্রশাসনিক ভুল’ নাকি রাজনৈতিক বার্তা?
ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে একটি টেকনিক্যাল বা ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ এরর’ হিসেবে হালকা করার চেষ্টা করলেও, একজন প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদার উপদেষ্টাকে আড়াই ঘণ্টা বসিয়ে রাখা কোনো সাধারণ ভুল হতে পারে না। বাংলাদেশের নতুন প্রশাসনের অধীনে যখন ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক একটি নতুন সমীকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন এই ঘটনাকে অনেকেই ভারতের একটি সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক বা রাজনৈতিক চাপ হিসেবে দেখছেন।
বিশেষ করে ডা. জাহিদুর রহমান অতীতে একজন প্রখ্যাত রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয়ে স্পষ্ট ও স্বাধীনচেতা মতামত দিয়ে এসেছেন। বিমানবন্দরে তাঁর মতো একজন ব্যক্তিত্বকে এভাবে আটকে দেওয়া তাই গভীর সন্দেহের জন্ম দেয়।
একটি সঠিক ও সাহসী সিদ্ধান্ত
ডা. জাহিদুর রহমান দিল্লিতে অনুনয়-বিনয় করে কিংবা অপমান গায়ে মেখে সম্মেলনে যোগ দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি বেছে নিয়েছেন আত্মসম্মানের ‘বড় রাস্তা’। তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—বাংলাদেশ এখন আর মাথা নিচু করে থাকার নীতিতে বিশ্বাসী নয়। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক সমতা ও সম্মানের ভিত্তিতে। কোনো একপাক্ষিক খবরদারি বা অপমান মেনে নিয়ে কূটনীতি চর্চার দিন শেষ।
তাঁর এই তাৎক্ষণিক প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির এক বড় দৃষ্টান্ত। এর মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে এবং দিল্লির দরবারে এই বার্তাই পৌঁছানো গেছে যে, বাংলাদেশের সরকারি প্রতিনিধিদের প্রটোকল নিয়ে হেলাফেলা করার সুযোগ নেই।
ঢাকা ও দিল্লির করণীয়
এই ঘটনার পর ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উচিত বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নেওয়া। ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করে এই ইমিগ্রেশন হয়রানির আনুষ্ঠানিক ও লিখিত কৈফিয়ত চাওয়া উচিত। অন্যদিকে, ভারতেরও বুঝতে হবে যে—প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন দূর করতে হলে তাদের নিজেদের সীমান্ত ও ইমিগ্রেশন ব্যবস্থাপনায় এ ধরনের বড় ত্রুটি ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ বন্ধ করতে হবে।
উপসংহার:
ডা. জাহিদুর রহমানের দিল্লি থেকে ফিরে আসা কেবল একজন ব্যক্তির ফিরে আসা নয়, এটি বাংলাদেশের আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার এক নতুন লড়াইয়ের প্রতীক। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ পররাষ্ট্রনীতির যে স্লোগান বর্তমান সরকার ধারণ করছে, বিমানবন্দরে উপদেষ্টার এই আপোষহীন অবস্থান তারই বাস্তব প্রতিফলন। দিল্লিকে বুঝতে হবে, সম্মান দিলে তবেই সম্মান মিলবে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ছাড়া কোনো টেকসই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে না।